কোটি কোটি টাকা নিয়ে পালিয়ে গ্রাহকদের শান্তনার বাণী শুনাচ্ছে আঁখি সুপার শপ

প্রকাশিত: ৩:৩২ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ৪, ২০২২

কোটি কোটি টাকা নিয়ে পালিয়ে গ্রাহকদের শান্তনার বাণী শুনাচ্ছে আঁখি সুপার শপ

নিজস্ব সংবাদদাতা : সিলেটে ‘একটি পণ্য কিনলে আরেকটি ফ্রি’ এমন প্রলোভন দেখিয়ে গ্রাহকদের কাছ থেকে কয়েক কোটি টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগ পাওয়া গেছে ‘আঁখি সুপার শপ’ নামের একটি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। এ নিয়ে দুজন গ্রাহক রোববার (২ জানুয়ারি) সিলেট আদালতে মামলা দায়ের করেছেন। সিলেট মহানগর হাকিম প্রথম আদালতের বিচারক মো. সাইফুর রহমান অভিযোগ আমলে নিয়ে মামলা দুটি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) নির্দেশ দিয়েছেন তদন্ত করতে। আর এদিক ভুক্তভোগীদের কোটি কোটি টাকা নিয়ে সিলেট থেকে পালিয়ে কথিত আঁখি সুপার শপের দম্পত্তি তাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফেসবুকে আঁখি সুপার শপ নামে ফেসবুক পেজ থেকে একের পর এক শান্তনার বাণী শুনাচ্ছে।

দেখা গেছে আঁখি সুপার শপ নামে ফেসবুক পেজ থেকে কয়েকটি ব্যাখ্যা দিয়েছে আঁখি সুপার শপ কর্তৃপক্ষ। যেখানে সিলেটে না আসতে পারার পেছনে ‘নিরাপত্তাহীনতার’ কথা বলছে তারা। তাদের কাছে নাকি ২ কোটি টাকা চাঁদা দাবি করা হয়েছে। তবে কে বা কারা চাঁদা দাবি করেছে, তা উল্লেখ করেনি তারা। আঁখি সুপার শপ কর্তৃপক্ষ যা লিখেছে, তা পাঠকের বুঝার সার্থে হুবুহু এরকম তুলে ধরা হল- “নিরাপত্তাহীনতার কারণে আমরা চাইলেও সিলেটে আসতে পারছিনা… আমরা চাই একটা সুষ্ঠু পরিবেশ সৃষ্টি হোক। আর আপনারাই পারেন সেই পরিবেশ তৈরি করতে। সেদিন সিলেট থেকে ঠিক সময়ে বের হয়ে না আসতে পারলে পরদিন আমাদের লাশ বের হতো। ২ কোটি টাকা চাঁদা দাবি করা হয় আমাদের কাছ থেকে… হয় টাকা দিবো না হলে মেরে ফেলার হুমকি দেয়া হয়, অথচ মাসের শুরুতে ১ কোটি টাকা দিয়েছিলাম…. প্রতি মাসে মাসে এভাবে নিজের প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে কোটি টাকা আমাকে দিতে বাধ্য করা হয়… এভাইবেই গত ১ বছরে ১০ কোটি টাকা আমার কাছ থেকে বিভিন্ন উপায়ে আত্মসাৎ করা হয়… গত একবছরে কি নিখুঁতভাবে কাজ করে আসছি আপনার তার সাক্ষী ছিলেন… ডেলিভারি সবসময় দু-চারদিন এক সপ্তাহ আগে পেয়েছেন, কিন্তু টাইম কখনো পার হয়নি… আজকে আমরা বিপদে পরেছি কে বা কারা আমাদের বিপদে ফেললো আপনারা একবারো বুঝতে চাইলেন না… উল্টা প্রতারক বলছেন! এতো সার্ভিস নিয়েছেন কখনো কেউ বলতে পারবেন আমাদের সার্ভিসে আপনারা অসন্তুষ্ট ছিলেন নিজের মনকে একবার প্রশ্ন করুন! আমরা একটা সমঝোতা চেয়েছিলাম যার কারণে এস.পি, ডিসি মহাদয়ের কাছেও গিয়েছিল। আমরা একটু সময় চাই… আর এই সময়টা আপনারা চাইলেই দিতে পারেন..আমাদের উদ্দেশ্য কখনোই অসৎ ছিলোনা… আপনারা চাইলেই আঁখি সুপার শপ আবারো ঘুরে দাঁড়াতে পারে। আমরা চাই আপনাদের প্রাপ্য আপনাদেরকে সুন্দরভাবে বুঝিয়ে দিতে। বাকিটা আপনাদের ইচ্ছা…”।

রবিবার (২ই জানুয়ারি) সিলেটের আদালতে সিলেট নগরীর শাহপরান উপশহর এলাকার বাসিন্দা মো. জিয়াউর রহমান (৪০) ও মো. আশরাফ হোসেন (৪৭) পৃথক মামলা করেছেন। বাদীপক্ষের আইনজীবী মো. ফয়সাল আহমেদ ও মোহাম্মদ আবদুল বাতেন সাংবাদিকদের এমন তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

উভয় মামলার আসামিরা হচ্ছেন- ‘আঁখি সুপার শপ’ এর মালিকপক্ষ রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার হাসনীপুর গ্রামের আসমা শারমিন আঁখি (২৬) ও পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার পুন্ডুরিয়া গ্রামের মো. জাহাঙ্গীর আলম (৩১)। অজ্ঞাত আরও ৪-৫ জনকে আসামি করা হয়েছে মামলায়।

আঁখি ও জাহাঙ্গীর সিলেট শহরতলির বটেশ্বর গইলাপাড়া এলাকায় ‘আঁখি সুপার শপ’ নামের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতেন। বাদীপক্ষের অভিযোগ, গেল কিছুদিন ধরে প্রতিষ্ঠানটি তালাবদ্ধ।

মামলার এজাহারে উল্লেখ রয়েছে, আঁখি সুপার শপ কর্তৃপক্ষ ‘একটি পণ্য কিনলে একই পণ্য আরেকটি ফ্রি তথা শতভাগ ক্যাশব্যাক’ বলে ফেসবুকে নিজেদের পেজে প্রচারণা চালায়। এমন প্রচারণায় মামলার বাদীগণ আরও কয়েকজনকে সাথে নিয়ে ওই প্রতিষ্ঠানে যান। গেল বছরের জুলাই থেকে নভেম্বর অবধি দুটি মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন ধরনের ইলেকট্রনিকস পণ্য এবং তেল ও দুধ ক্রয়ের জন্য তারা একটি বেসরকারি ব্যাংকের মাধ্যমে আঁখি সুপার শপের অ্যাকাউন্টে টাকা জমা দেন। টাকা জমা দেওয়ার পর কর্তৃপক্ষ তাদেরকে ক্রয় রশিদ প্রদান করে দ্রুত পণ্য হোম ডেলিভারি দেওয়া হবে বলে জানায়। কিন্তু পণ্য না পেয়ে তারা প্রতিষ্ঠানটির ফোন নম্বরে কল করে সেটি বন্ধ পান। পরবর্তীতে তারা প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়ে গিয়ে সেটি তালাবদ্ধ দেখতে পান। অন্যান্য গ্রাহকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে পণ্য না পাওয়া ও প্রতারিত হওয়ার বিষয়টি টের পান তারা।

একটি মামলার বাদী ভুক্তভোগী মো. জিয়াউর রহমান ৩ লাখ ৭ হাজার ২০০ টাকা এবং অপর মামলার বাদী আশরাফ হোসেন ৯ লাখ ৬১ হাজার ৭২০ টাকা প্রতারণার শিকার হয়েছেন বলে এজাহারে উল্লেখ করেছেন। তবে অন্যান্য গ্রাহকের কাছ থেকে নেওয়া টাকাসহ কোটি কোটি টাকা আঁখি সুপার শপ কর্তৃপক্ষ আত্মসাৎ করেছে বলে তারা অভিযোগ প্রকাশ করেন।

এদিকে, আঁখি সুপার শপের প্রতারণার ফাঁদে পড়া গ্রাহকরা এখন অনিশ্চয়তায় ভুগছেন। তাদের মধ্যে ক্ষোভের ঝড় বইছে।

গত ২৭ ডিসেম্বর প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কার্যালয়ে গিয়ে সেটি তালাবদ্ধ দেখে গ্রাহকরা বিক্ষোভ করেন। এছাড়া গত শনিবার (১ জানুয়ারি) বটেশ্বর এলাকার গইলাপাড়ায় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন গ্রাহকরা। ভুক্তভোগী গ্রাহকরা বিক্ষোভে অবস্থানকালীন সময়ে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন- যে তারা স্থানীয় থানায় মামলা করতে গেলে থানা পুলিশ তাদের মামলা নেয় নি তাই আইনের সহযোগিতা পাওয়ার জন্য মূলত তারা সড়ক অবরোধ করেছেন।

ভুক্তভোগী গ্রাহকদের অভিযোগ- ২০১৯ সালের ডিসেম্বর থেকে অনলাইনভিত্তিক ব্যবসা করে আসছে আঁখি সুপার শপ। এর বাইরে বটেশ্বরে নিজস্ব কার্যালয়েও তারা ব্যবসা পরিচালনা করতো। বিভিন্ন সময়ে তারা অফারের মাধ্যমে কম দামে বা একটি কিনলে আরেকটি পণ্য ফ্রি দেওয়ার ঘোষণা দিত। অফারে অংশ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে কিছু গ্রাহক ফ্রি পণ্য পেয়েছেন। এতে অন্যান্য গ্রাহকের আস্থা অর্জন করে প্রতিষ্ঠানটি। এই আস্থাকে কাজে লাগিয়ে তারা মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিকস পণ্য একটি কিনলে আরেকটি ফ্রি দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে প্রচারণা চালায়। আগে কিছু গ্রাহক ফ্রি পণ্য পাওয়ায় এবার মোটরসাইকেল কিনতে হুমড়ি খেয়ে পড়েন অন্যান্য গ্রাহকরা। কয়েকশ’ মোটরসাইকেলের অর্ডার পায় আঁখি সুপার শপ কর্তৃপক্ষ। এর মাধ্যমে তারা গ্রাহকদের ১৫ থেকে ২০ কোটি টাকার মতো হাতিয়ে উধাও হয়েগেছে।

মাসুম নামের একজন গ্রাহক গত ১৬ ডিসেম্বর সুজুকি কোম্পানির ২ লাখ ৪৫ হাজার টাকা দামের একটি মোটরসাইকেল অর্ধেক দাম তথা ১ লাখ ২২ হাজার ৫০০ টাকায়, বাজাজ কোম্পানির এক লাখ ৮৪ হাজার টাকার একটি মোটরসাইকেল অর্ধেক দাম তথা ৯২ হাজার টাকায় অর্ডার করেছিলেন। এখন আঁখি সুপার শপ তালাবদ্ধ ও কর্তৃপক্ষ পলাতক থাকায় তিনি মাথা চাপড়াচ্ছেন। ফেসবুকে আহমেদ মাসুম ক্রয় রশিদের ছবি দিয়ে লিখেছেন, “জীবন্ত লাশ করে দিচ্ছে…’।

আঁখি সুপার শপ ফেসবুক পেজ ঘুরে আরো দেখা যায়, গত (২৯ ডিসেম্বর) কর্তৃপক্ষ একটি ঘোষণা দিয়ে শান্তনার বাণী শুনাচ্ছে গ্রাহকদের তা পাঠকের বুঝার সার্থে হুবুহু এরকম তুলে ধরা হল- “পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির কারণে সাময়িকভাবে আঁখি সুপার শপ বন্ধ রাখা হয়েছে। আপনারা কেউ বিভ্রান্ত হবেন না। একটু ধৈর্য রাখুন… আমরা আছি… প্লিজ আমাদের কেউ ভুল বুঝবেন না…”।

প্রতিষ্ঠানটির ফেসবুক পেজে মোটরসাইকেল, স্মার্টফোন, শাড়ি, পাঞ্জাবিসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্যের প্রচারণা দেখা গেছে। তারা কয়েকটি মোটরসাইকেল গ্রাহককে বুঝিয়ে দিয়েছে, এমন ছবি ও তথ্য ফেসবুকে প্রচার করেছে।

আঁখি সুপার শপের ০১৮১৪২১৫৩০১ এবং ০১৭৩১২০৮৭০৮ নাম্বারে একাধিক কল করেও সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। তাই কর্তৃপক্ষের বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ