বছরে ৪০০ কোটি টাকা খরচ নোট ছাপাতে

প্রকাশিত: ১:৪২ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১৮, ২০২৩

বছরে ৪০০ কোটি টাকা খরচ নোট ছাপাতে

ডেস্ক রিপোর্ট: বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ইস্যু করা বিভিন্ন মূল্যমানের নোট ছাপাতে বছরে গড়ে খরচ হচ্ছে ৪০০ কোটি টাকা। কোনো কোনো বছর এ খাতে খরচ ৫০০ কোটি টাকার কাছাকাছি চলে যাচ্ছে। এর বাইরেও নোট পরিবহণ, ব্যবস্থাপনা, অপ্রচলনযোগ্য নোট পুড়িয়ে ফেলার ক্ষেত্রে রয়েছে আরও খরচ। নোট ছাপার বিভিন্ন উপকরণ কাগজ, কালি, নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্যসহ অন্যান্য সামগ্রীর দাম বাড়ায় নোট ছাপানোর খরচও বেড়েছে।

 

তবে ডিজিটাল লেনদেনের মাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় নগদ নোটের চাহিদা কমছে। ডিজিটাল লেনদেন বাড়িয়ে ক্যাশলেস সোসাইটি বা নগদ লেনদেনবিহীন গোষ্ঠী গড়ে তোলার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইতোমধ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। এগুলো বাস্তবায়ন হলে নোটের চাহিদা ধীরে ধীরে কমে যাবে। ইতোমধ্যে ডিজিটাল লেনদেন বৃদ্ধি পাওয়ায় নগদ লেনদেনের চাহিদা কিছুটা কমেছে।

 

গত বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী বাজারে ১০ টাকার নোট ১৫১ কোটি ৪১ লাখ পিস, ২০ টাকার নোট ৮২ কোটি ৮ লাখ পিস, ৫০ টাকার নোটি ৪৬ কোটি ৪৩ লাখ পিস, ১০০ টাকার নোট ১২৭ কোটি ১৩ লাখ পিস, ২০০ টাকার নোট ১৬ কোটি ৩১ লাখ পিস, ৫০০ টাকার নোট ১৯৭ কোটি ৫১ লাখ পিস ও ১০০০ টাকার নোট ১৩৪ কোটি ৩২ লাখ পিস চালু রয়েছে। এগুলো স্থানীয়ভাবে ছাপানো হয়েছে।

 

সূত্র জানায়, বর্তমানে সব নোটই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শতভাগ মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান গাজীপুরে দ্য সিকিউরিটি অ্যান্ড প্রিন্টিং করপোরেশন (বাংলাদেশ) লিমিটেডে (এসপিসিবিএল) ছাপা হয়। এ কারণে একে ‘টাকশাল’ও বলা হয়। ওখান থেকে ছাপানো নোট বাংলাদেশ ব্যাংকের ১০টি শাখা অফিসে চাহিদা অনুযায়ী পাঠানো হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সেগুলো বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে বাজারে ছাড়ে। নোট ছাপানোর সব ধরনের কাগজ, কালি, নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্যসহ অন্যান্য উপকরণ বিদেশ থেকে আমদানি হয়। এর মধ্যে সুইজারল্যান্ড থেকে কাগজ, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি, সুইডেনসহ বিভিন্ন দেশ থেকে বিভিন্ন উপকরণ আমদানি করা হয়। সব খরচ মিলে এ খাতে চলে একটি বিশাল কর্মযজ্ঞ।

 

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ১০ বছর ধরে নোট ছাপানোতে গড়ে খরচ হচ্ছে ৪০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২০১৯-২০ অর্থবছর থেকে গত অর্থবছর বছর পর্যন্ত গড়ে প্রতি বছর খরচ হয়েছে ৩৫০ কোটি টাকা করে। এর আগের তিন অর্থবছরে অর্থাৎ ২০১৬-১৭ থেকে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে প্রতি বছর গড়ে খরচ হয়েছিল ৪৪৭ কোটি টাকা করে। বেশি নোট ছাপা হওয়া ও আন্তর্জাতিক বাজারে উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে ওই তিন অর্থবছরে সবচেয়ে বেশি অর্থ খরচ হয়েছে। আগে বিদেশে নোট ছাপিয়ে দেশে এনে বাজারে ছাড়া হতো। ১৯৮৮ সাল থেকে টাকশালে নোট ছাপানো শুরু হয়। ওই সময় থেকে নোট ছাপার উপকরণ আমদানি করা হচ্ছে। প্রথম বছরে ২৬ কোটি ৪৪ লাখ পিস নোট ওখানে ছাপা হয়েছিল। বর্তমানে প্রায় ১৩০ কোটি পিস নোট ছাপা হয়।

 

গত তিন অর্থবছরের প্রতি বছরই ৩০০ কোটি টাকার বেশি খরচ হয় নোট ছাপাতে। এর মধ্যে ২০২১-২২ অর্থবছরে খরচ হয় ৩৮৪ কোটি টাকা। যা আগের অর্থবছরের চেয়ে প্রায় ১৩ শতাংশ বেশি। ২০২০-২১ অর্থবছরে খরচ হয় ৩৪০ কোটি টাকা। যা আগের বছরের তুলনায় ৮ দশমিক ২৮ শতাংশ বেশি। ২০১৯-২০ অর্থবছরে খরচ হয় ৩১৪ কোটি টাকা। যা আগের বছরের চেয়ে ৩৯ শতাংশ কম। অর্থাৎ আলোচ্য তিন বছরের মধ্যে দুই বছর খরচ বেড়েছে এক বছর কমেছে।

 

২০১৬-১৭ থেকে ২০১৮-১৯ এই তিন অর্থবছরে নোট ছাপাতে সবচেয়ে বেশি খরচ হয়েছে। প্রতি বছর গড়ে খরচ হয় ৪৪৭ কোটি টাকা। ওই সময়ে বেশি নোট ছাপানো হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে নোট ছাপার উপকরণের দাম বেশি বেড়েছিল। যে কারণে খরচও বেড়েছে বেশি। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ব্যয় হয় ৪৮১ কোটি টাকা। যা আগের বছরের চেয়ে ১২ দশমিক ৩৮ শতাংশ বেশি। এটাই ছিল সবচেয়ে বেশি খরচ। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ব্যয় হয় ৪২৮ কোটি টাকা। যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১ শতাংশ কম। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৪৩১ কোটি টাকা খরচ হয়। যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি। আলোচ্য তিন বছরের মধ্যেও দুই বছর খরচ বেড়েছে ও এক বছর সামান্য কমেছে।

 

২০০৪-০৫ থেকে ২০০৬-০৭ এই তিন অর্থবছরে নোট ছাপানোর খরচ ছিল শত কোটি টাকার নিচে। ২০০৭-০৮ অর্থবছরে নোট ছাপানোর খরচ প্রথম বারের মতো শত কোটি টাকা অতিক্রম করে। ওই বছর থেকে ২০০৯-১০ এই তিন অর্থবছর পর্যন্ত এসংক্রান্ত ব্যয় ২০০ কোটি টাকার নিচে থাকে। ২০১০-১১ অর্থবছরে এটা ২০০ কোটি টাকা অতিক্রম করে। ২০১১-১২ অর্থবছরেও একই অর্থ খরচ হয়। ২০১২-১৩ থেকে ২০১৫-১৬ এই চার অর্থবছর খরচ হয় ৩০০ কোটি টাকার বেশি।

 

২০১৫-১৬ অর্থবছরে নোট ছাপাতে খরচ হয় ৩৩২ কোটি টাকা। যা আগের বছরের তুলনায় ১৩ শতাংশ কম। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে খরচ হয় ৩৮২ কোটি টাকা। যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২ শতাংশ কম। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে নোট ছাপাতে লাগে ৩৮৯ কোটি টাকা। যা আগের বছরের তুলনায় সাড়ে ১৫ শতাংশ বেশি। ২০১২-১৩ অর্থবছরে ব্যয় হয় ৩৩৭ কোটি টাকা। যা আগের বছরের তুলনায় ৬০ দশমিক ৪৮ শতাংশ বেশি।

 

২০১১-১২ ও ২০১০-১১তে প্রতি বছর খরচ হয় ২১০ কোটি টাকা করে। ২০০৯-১০ অর্থবছরের তুলনায় আগের ২০১০-১১ অর্থবছরে খরচ বেড়েছিল ৫০ শতাংশ। ২০০৯-১০ অর্থবছরে নোট ছাপাতে খরচ হয় ১৪০ কোটি টাকা। যা আগের অর্থবছরের তুলনায় সাড়ে ১২ শতাংশ কম। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে খরচ হয় ১৬০ কোটি টাকা। যা আগের অর্থবছরের তুলনায় সাড়ে ৪৫ শতাংশ বেশি।

 

২০০৭-০৮ অর্থবছরে খরচ হয় ১১০ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরের তুলনায় ২২ দশমিক ২২ শতাংশ বেশি। ২০০৬-০৭ অর্থবছরে খরচ হয় ৯০ কোটি টাকা। যা আগের অর্থবছরের চেয়ে ৫০ শতাংশ বেশি। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে খরচ হয় ৬০ কোটি টাকা। যা আগের অর্থবছরের চেয়ে ১৪ দশমিক ২৯ শতাংশ বেশি। ২০০৪-০৫ অর্থবছরে খরচ হয় ৭০ কোটি টাকা।

 

প্রতিবেদনে বলা হয়, নোট ছাপানো ও ব্যবস্থাপনার খরচ ও জটিলতা কমাতে নগদ অর্থের লেনদেনের পরিবর্তে ডিজিটাল লেনদেন বাড়ানোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এ কারণে ইতোমধ্যে ডিজিটাল লেনদেন বাড়ছে। গ্রাহকদের চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল, সিঙ্গাপুর, হংকং, মালয়েশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে ডিজিটাল ব্যাংকিং ব্যবস্থা চালু করেছে। ফলে তাদের দেশে বেশির ভাগ অর্থের লেনদেন হচ্ছে ডিজিটাল মাধ্যমে। এতে ছাপানো নোটের প্রবণতা কমে গেছে। ফলে নোট ব্যবস্থাপনার বাড়তি ঝামেলা যেমন কমেছে, তেমনি কমছে নোট ব্যবস্থাপনার খরচও। একই সঙ্গে কমেছে জাল নোটের প্রবণতাও। ওই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে চায় বাংলাদেশও।

 

বাংলাদেশেও জিডিটাল ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রসার হচ্ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে ডিজিটাল লেনদেন। বিকাশ, রকেটসহ অন্যান্য মোবাইল ব্যাংকিং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম প্রসারিত হচ্ছে। ইতোমধ্যে তারা সেবার পরিধি বাড়িয়ে আংশিকভাবে এর ব্যাপক সম্ভাবনার কথা প্রমাণ করেছে।

 

ডিজিটাল ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রসারে যেমন অনেক সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, তেমনি অনেক ঝুঁকি মোকাবিলা করতে হচ্ছে। এসব নিরাপত্তা ঝুঁকি, গোপনীয়তা লঙ্ঘন, সেবা প্রদানে অসমতা, সাইবার অপরাধ, পদ্ধতিগত ঝুঁকি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। উন্নত গ্রাহক সেবা, ব্যয় কমানো এবং অধিক স্বচ্ছতার জন্য আধুনিক ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা থেকে সুবিধা গ্রহণ করতে ইচ্ছুক গ্রাহকদের ঝুঁকি সম্পর্কে জানাতে হবে। এ বিষয়ে তাদের সচেতন করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো পদক্ষেপ নিচ্ছে।