শাহপরানে  “আখি সুপার শপ” নামে প্রতারণার ফাঁদ

প্রকাশিত: ৩:৩৪ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২৫, ২০২১

শাহপরানে  “আখি সুপার শপ” নামে প্রতারণার ফাঁদ
ক্রাইম প্রতিবেদক : সিলেটে দিন দিন বেপরোয়া হারে ব্যাঙ্গের ছাতার মত গজিয়ে উঠেছে ই-কমার্স ব্যবসার নামে প্রতারণার ছল।  চম্কপ্রদ বিজ্ঞাপন আর বিভিন্ন লোভনীয় অফারে যেমন অল্প কিছু সংখ্যক ভোক্তা লাভমান হয়েছেন তার চেয়ে প্রতরণার শিকারও হয়েছেন অহরহ। আর এসকল ঝক্কি-ঝামেলার মাঝেও সিলেটের আনাচে-কানাচেতে গজিয়ে উঠেছে ই-কমার্স নামধারী বহু ভূঁইফোড় প্রতিষ্ঠান। এসব ব্যবসার জন্য সংশ্লিষ্ট সকল লাইসেন্স ও কোন নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই তারা চালিয়ে যাচ্ছে এমন অবৈধ ব্যবসা।
ঠিক তেমনি গ্রাহকদের প্রতারণা করে গ্রাহকের কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার ফাঁদ পেতেছে কথিত এক “আখি সুপার শপ” নামের ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান।  শাহপরান (রহ.) থানাধীন বটেশ্বর আয়শা ব্যাংকের পাশে অবস্থিত এই কথিত প্রতিষ্ঠানটি। তারা স্থানীয় ইউ.পি চেয়ারম্যানের কিছু কাছের লোকের মাধ্যমে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ থেকে একটি ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে চালিয়ে যাচ্ছে এই অবৈধ ই-কমার্স ব্যবসা।
লোভনীয় অফার দিয়ে গ্রাহকদের আকর্ষন বাড়াচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। আর এসব প্রতারণার বিষয়টি জেনে শুনে অল্প কিছু টাকার বিনিময়ে তাদের নেতৃত্ব দিচ্ছে স্থানীয় একটি বখাটে অসাধু যুবক চক্র।  “বাই ওয়ান গেট ওয়ান” অফারের নামে একটি মোটরযান ফ্রি দেওয়ার উরাধুরা অফার দিচ্ছে এই কথিত প্রতিষ্ঠানটি।
তাছাড়া এই কথিত ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে স্থানীয় পুলিশের চিহ্নিত এক দালালের মাধ্যমে শাহপরান (রহ.) থানা পুলিশের বিভিন্ন স্তরের পুলিশ কর্মকর্তাদেরও অংশগ্রহণ করতে দেখা যায় প্রায় সময়েই।
অনুসন্ধানে জানা গেছে- আকি সুপার শপ ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান গ্রাহকদের একটি মোটরযানের সাথে আরেকটি মোটরযান ফ্রি দেয়ার অফার দিচ্ছে।  তাদের নিয়ম হচ্ছে একটি মোটরযানের পুরো টাকা জমা দিলে ৪ মাস পর তারা একসাথে ২টি মোটরযান দেয়। যা গত ৩১ জানুয়ারি ২০২১ বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত গ্রেজেট নং- ২৬.০০.০০০০.১৩৩.৯৩.০২৬.১৯.৫৮ জাতীয় ই-কমার্সের নীতিমালা ২০১৮ এর সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
সরকারের নিয়ম অনুযায়ী ই-কমার্স ব্যবসা পরিচালনা করতে যে সকল লাইসেন্স দরকার তা তার একটিও তাদের নেই। এভাবে কোন এক অদৃশ্য শক্তির বলে তারা গত ৮/৯ মাস থেকেই সম্পূর্ণ বেআইনীভাবে ওই ব্যবসাটি পরিচালনা করতেছে। দেশে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী-অনলাইন পণ্য অর্ডার করার ১০ দিনের ভিতরেই তা গ্রাহকের হাতে পৌঁছে দিতে হয়। কোনভাবেই পণ্যের সম্পূর্ণ দাম অগ্রিম নেওয়া যাবে না। কিন্তু অদৃশ্য পেশীশক্তির বলে অবৈধভাবে এসব চলছে স্থানীয় থানা পুলিশের নাকের ডগায়।
জানা গেছে- জাহাঙ্গীর আলম ও আখি নামের এক দম্পতি প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই এই অবৈধ ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করে আসছেন দীর্ঘদিন যাবত। তা না হলে পুলিশ কেনও তাদের এই অবৈধ ই-কমার্স ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের যে কোন আয়োজনে অতিথি হিসেবে যোগ দেন বলে তুলেছেন সচেতন মহল প্রশ্ন!  শুধু তাই নয় আর তাদের মদদ দিচ্ছে স্থানীয় কিছু অসাধু বিপদগামী যুবক চক্র। এই যুবক চক্রের প্রভাব খাটিয়ে দীর্ঘদিন যাবত এমন অবৈধ ই-কমার্স ব্যবসা চালাচ্ছে জাহাঙ্গীর।
তবে ই-কমার্স ব্যবসার বিশেষজ্ঞরা বলছেন অন্য কথা। তাদের এই একটি মোটরযানের সাথে আরেকটি মোটরযান ফ্রির লোভনীয় অফারে যদি ১০০০ গ্রাহক অর্ডার করেন তবেই কয়েক’শ কোটি টাকা নিয়ে গা ডাকা দেয়ার সম্ভাবনা রয়েছে কথিত আখি সুপার শপ ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের। কারণ এই প্রতিষ্ঠানের ঠিকে থাকার জন্য কোন বৈধ লাইসেন্স নেই। যেখানে সকল বৈধ কাগজপত্র ও বিভিন্ন স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি থাকার পরও ইভ্যালি এবং ই-অরেঞ্জের মত প্রতিষ্ঠান থেকে গ্রাহকরা প্রতারিত হচ্ছেন সেখানে এরকম অবৈধ ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান থেকে গ্রাহকরা প্রতারিত হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় শতভাগ।
এব্যাপারে জানতে চাইলে “আখি সুপার শপের” কর্নধার জাহাঙ্গীর আলম ‘বাই ওয়ান গেট ওয়ান’ অফারের কথা স্বীক্ষার করেন। তিনি ই-কমার্স সংক্রান্ত ব্যবসার কোন বৈধ লাইসেন্স সাংবাদিকদের দেখাতে অনিচ্ছুক। তিনি রাষ্ট্রপক্ষ, দুদকসহ প্রশাসনের লোককে দেখাবো বলে হুংকার দেন। সাংবাদিকরা কি তাহার লাইসেন্স সত্যতা নিশ্চিতের জন্য দেখতে পারেন না এমন প্রশ্নের জাবাবে তিনি বলেন- যেখানে শাহপরান (রহ.) থানা ও শাহপরান (রহ.) মাজার পুলিশ তদন্ত কেন্দ্র এসব নিয়ে কোন সমস্যা করছেন না তাহলে আপনাদের এতো মাথা ব্যাথা কেন বলে প্রতিবেদককে উল্টো প্রশ্ন করেন। তিনি কোন ভাবেই তার ই-কমার্স ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের  বৈধ লাইসেন্স আদও সত্যি আছে কি নেই এই তথ্য প্রতিবেদককে দিতে অনিচ্ছুক। তিনি হুংকার দিয়ে প্রতিবেদকে মামলারও হুমকি দেন। তবে  সর্বশেষে একপর্যায়ে প্রতিবেদকের সাথে রাত ৮ টার পর দেখা করবে বলে আপাতত প্রতিবেদনটি প্রকাশ না করার জন্য অনুরোধ জানান। এখানে প্রশ্ন আসলে কি তার বৈধ লাইসেন্স আছে কি নেই?
এব্যাপারে সিলেটের বিশিষ্ট আইনজ্ঞরা জানান- ই-কমার্স ব্যবসা করার জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের লাইসেন্স প্রয়োজন এবং ই-কমার্সের সম্পূর্ণ প্যসেন্ট অগ্রিম নেয়ার কোন বিধান নেই। কেস অন ডেলিভারি দিতে হবে। একটি মোটরযানের সাথে আরেকটি মোটরযান ফ্রি দেয়া এটি মাল্টিলেভেল মার্কেটিংয়ের মধ্যে পড়ে যায়। যা প্রথম প্রথম দিবে এবং এক সময় টাকা পয়সা নিয়ে উধাও হয়ে যাবে। এটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন বলে তারা মনে করেন। অন্যথায় কর্মমজুররা প্রতারিত হওয়ার সম্ভাবনাই শতভাগ।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়ের উপ-পরিচালক ফখরুল ইসলাম বলেন- আমাদের কাছে এই সংক্রান্ত কোন তথ্য নেই আপতত।  আমরা অবিলম্বে গুরুত্বসহকারে বিষয়টি খতিয়ে দেখছি।
এসএমপির মুখপাত্র এডিসি বিএম আশরাফ উল্লাহ তাহের বলেন- ইতিমধ্যেই বিষয়টি আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। ই-কমার্স ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতে হলে বাণিজ্যিমন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সকল লাইসেন্স নিয়ে এবং নিয়ম কানুন মেনেই করতে হবে। শুধুমাত্র একটি ইউনিয়ন পরিষদের ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে এই ব্যবসা করা হয়ে থাকলে এটি অবৈধ কার্যক্রম। তাতে করে জনসাধারণের প্রতারিত হওয়ার সম্ভাবনা আছে। আমরা বিষয়টি অতিশীঘ্রই খতিয়ে দেখছি।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ